Breaking News
Home / NEWS / নতুন রূপান্তরিত ক’রো’না’ভা’ই’রা’স কতটা মারাত্মক এবং আমাদের করণীয়

নতুন রূপান্তরিত ক’রো’না’ভা’ই’রা’স কতটা মারাত্মক এবং আমাদের করণীয়

ভাইরাস মাত্রই বারবার রূপান্তরিত বা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনকে বলে ‘মিউটেশন’। বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখাটাকে জরুরি মনে করেন। ভাইরাসের এই রূপান্তরের ঘটনা কখনো কখনো খুব আক্রমণাত্মক বা ভয়ংকর হয়। আবার কখনো কখনো ভাইরাসটি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে।

চলমান মহামারি করোনাভাইরাসের (সার্স কোভ-২) একটি নতুন রূপান্তরিত প্রকার বা স্ট্রেন সম্প্রতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাজ্যে। পাশাপাশি ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া ও সাউথ আফ্রিকার পর সম্প্রতি নাইজেরিয়া, সিঙ্গাপুর, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, বেলজিয়া ইত্যাদি দেশেও এই নতুন স্ট্রেনের কেস শনাক্ত হয়েছে; রূপান্তরিত ভাইরাসের অস্তিত্ব মিলেছে। যুক্তরাজ্যের গবেষকরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের পূর্ববর্তী সব প্রভাবশালী স্ট্রেনের চেয়ে এটি ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রমণযোগ্য। তা ছাড়া এই নতুন রূপান্তরে অনেক মিউটেশন নির্দিষ্ট একটি প্রোটিনে হয়েছে একই সঙ্গে, যাকে বলে ক্লাস্টার মিউটেশন। এ জন্যই এটি বেশি ক্ষতিকর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কী এই রূপান্তর?
বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এর জিন ম্যাপিংয়ে প্রায় হাজার হাজার ধরন পাওয়া গেছে। তবে ইংল্যান্ডের এবারের রূপান্তর বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর। তাই এটি নিয়ে ভয় করা হচ্ছে দুটি কারণে।

প্রথমত : করোনাভাইরাসে স্পাইক প্রোটিনে পাওয়া গেছে ১৭টি মিউটেশন। এই স্পাইক প্রোটিন ব্যবহার করেই করোনাভাইরাস প্রবেশ করে দেহকোষে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনে যে ১৭টি মিউটেশন ঘটেছে, তা একসঙ্গে বিদ্যমান। অর্থাৎ সব কটি মিউটেশন একই জায়গায় বিদ্যমান। পরিবর্তন ঘটেছে অ্যামাইনো এসিডেও। যেহেতু অ্যামাইনো এসিড দিয়ে প্রোটিন অণু গঠিত, তাই একসঙ্গে ১৭টি মিউটেশনের কারণে স্পাইক প্রোটিনের গঠনে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। আর এ কারণেই রূপ পরিবর্তন করেছে ভাইরাসটি। তুলনামূলকভাবে উচ্চসংখ্যার পরিবর্তনগুলোর মধ্যে কিছু এর প্রসারের এবং সংক্রমণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। তাই মূল উদ্বেগের কারণ হলো, রূপান্তরিত স্ট্রেনটি মূল স্ট্রেনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আরো সংক্রমণযোগ্য হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের নতুন এই রূপান্তর বা মিউটেশন ভাইরাসটিকে পরিণত করেছে অত্যন্ত সংক্রমণশীল এক মিউট্যান্ট ভাইরাসে।

দ্বিতীয়ত : ধারণা করা হচ্ছে, এই স্ট্রেন প্রাপ্তবয়স্কদের মতো শিশুদেরও সংক্রমিত করতে পারে বেশি মাত্রায়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ও সংক্রামক রোগের মহামারি বিশেষজ্ঞ এবং New and Emerging Respiratory Virus Threats Advisory Group (Nervtag)-এর সদস্য নিল ফার্গুসন এমন মন্তব্য করেছেন শিশুদের ব্যাপারে, যদিও এখনো এ বিষয়ে তেমন প্রমাণ করা যাচ্ছে না। তাই আরো কিছু সময় অতিবাহিত হলে বোঝা যাবে আসলে শিশুদের ওপরে এর কতটা প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন স্ট্রেন কতটা মারাত্মক?
আমরা আশা করতে পারি, যতটা ভাবা হচ্ছে অতটা মারাত্মক না-ও হতে পারে করোনাভাইরাসের নতুন এই স্ট্রেন। কেননা মিউটেশনগুলোর কারণে ভাইরাস অতি দ্রুত ছড়ালেও কভিডে মারাত্মক পরিণতি হওয়ার প্রবণতা তেমন একটা দেখা যায়নি এখনো। ভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত ছড়ালেও মৃত্যুর হার বেশি হবে বা রোগীকে আরো বেশি জটিল করে তুলবে—এমন প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে সংক্রমণ বেশি হলে বেশি মানুষ অসুস্থ হবে, এটি সত্য কথা। আর বেশি মানুষ অসুস্থ হলে স্বাভাবিকভাবেই মোট মৃত্যুও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। আরো আশার কথা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নতুন স্ট্রেন এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।

ঝুঁকির কথা
নতুন করোনার রূপান্তরটি নিঃসন্দেহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কেননা পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে পড়েছে। তাই রূপান্তরিত এই ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকা অনেক বেশি জরুরি। এই নতুন মিউট্যান্ট ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা বেড়েছে ৭০ শতাংশ, আর-নট (RO) নাম্বারের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে ০.০৪ শতাংশ। আর-নট নাম্বার যত বেশি হবে, ভাইরাস সংক্রমণ বিস্তার হবে তত দ্রুত। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে করোনা মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে অন্যান্য দেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াবে।

ভ্যাকসিন কী কাজে দেবে?
নতুন এই স্ট্রেনের জন্য করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে এরই মধ্যে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাস নিয়ে এযাবৎ যতগুলো টিকা তৈরি হয়েছে তার সব কটির টার্গেটই হচ্ছে এর স্পাইক প্রোটিন। তাই এই প্রোটিনের গঠনগত পরিবর্তনে টিকা বা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, বর্তমান মিউটেশন ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।

এ মুহূর্তে আমাদের করণীয়
সব ফ্লাইটের যাত্রীদের নজরদারি : যুক্তরাজ্য থেকে এই মিউট্যান্ট ভাইরাসটি যাতে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে না যায় সে জন্য বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। অবশ্য এরই মধ্যে বিমান আরোহীদের মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক এবং সিঙ্গাপুরে ভাইরাসটি কিছুটা ছড়িয়েছে। হল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও পাওয়া গেছে একই ধরনের মিউট্যান্ট করোনাভাইরাস। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মিউটেটেড ভাইরাসটি আরো দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের নতুন মিউট্যান্ট করোনাভাইরাসটি যেন কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা করা উচিত। কেননা যুক্তরাজ্যে নতুন মিউট্যান্ট ভাইরাসটি পাওয়া গেছে সেপ্টেম্বর মাসে। আর এই মিউট্যান্ট ভাইরাসের কেন্দ্রস্থল হলো লন্ডন ও কেন্ট, যেখানে প্রচুর বাংলাদেশি বসবাস করেন এবং তাঁরা নিয়মিত দেশে আসেন।

জিনোম সিকোয়েন্স করা : সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেক ব্রিটেনপ্রবাসী দেশে এসেছেন। তাই এই রূপান্তরিত ভাইরাসটি বাংলাদেশে এসেছে কি না, তা জানতে প্রতি ১০০ কভিড-১৯ টেস্টে অন্তত পাঁচটি স্যাম্পলের জিন সিকোয়েন্স করা উচিত।

কঠোর কোয়ারেন্টিন : সংক্রমিতদের জরুরি পৃথক করে কঠোর কোয়ারেন্টিনে রাখা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমবারের মতো ভুল করলে চলবে না। প্রয়োজনে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে। আশার কথা, এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশগামী সব বিমান যাত্রীকে যথাযথ স্ক্রিনিং নিশ্চিত করাসহ বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রয়োজনে আরো কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে, যাতে সংক্রমিত যাত্রী চলাচল বন্ধ থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা : পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত স্কুল, কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মানা : একমাত্র সচেতনতাই পারে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে। এ জন্য শিশুসহ সবাইকে করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ মাস্ক পরিধান করা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান-পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুতে হবে। সব ধরনের জনসমাগম বন্ধ করতে হবে। শিশুদের অহেতুক বাইরে বেরোতে দেওয়া যাবে না।

Check Also

সরকারি হাসপাতালে Covaxin-এর দাম ৬০০টাকা, বেসরকারিতে ১২০০

সেরামের পর এবার ভারত বায়োটেক Bharat Biotech কোভ্যাক্সিনের Covaxin দাম ঘোষণা করল। রাজ্য সরকারগুলি কোভ্যাক্সিনের ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *