Breaking News
Home / WORLD / কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের প্রথম হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জেনে নিন সেই গল্প

কীভাবে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের প্রথম হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জেনে নিন সেই গল্প

করোনা আবহে যে কয়েকটি জিনিসের চাহিদা এবং ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল হ্যান্ড স্যানিটাইজার। কয়েক মাস আগেও নির্মাতা সংস্থা বা বিক্রেতারা ভাবতে পারেননি, রাতারাতি এর চাহিদা আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারাবিশ্বেই এর ব্যবহার, বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই জরুরি এখন।

করোনা প্রতিরোধে বারবার হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সব সময় তো আর হাতের কাছে সাবান জল পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে সফল বিকল্প অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার। তাও আবার হতে হবে ৬০ শতাংশের বেশি অ্যালকোহলযুক্ত। করোনার দৌলতে বিশ্ববাজারে লিকুইড সাবান এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চাহিদা বেড়েছে ৪০০ শতাংশ।

তবে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা এখনও বলেন, জীবাণুমুক্ত করার বিষয়ে যে কোনও সাবানের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার। কিন্তু জল ছাড়া তো আর সাবান ব্যবহারের উপায় নেই। তাই যেখানে জল নেই, সেখানে স্যানিটাইজার বিকল্পহীন। কিন্তু জানেন কি, ৫০ বছর আগে এর কোনও অস্তিত্ব ছিল না! কে আবিষ্কার করেছিল এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার? কবে থেকেই বা আর কেনই এর ব্যবহার শুরু হলো? এসব নিয়েই থাকছে আজকের এই প্রতিবেদন।

আজ থেকে প্রায় ৫৪ বছর আগে হাত পরিষ্কার রাখার জন্য মানুষের প্রধান ভরসা ছিল সাবান-জল। কিন্তু হাসপাতালের কাজের মধ্যে সবসময় সাবান আর জল দিয়ে হাত পরিষ্কার সম্ভব হচ্ছিল না। তা ছাড়া, কাজটি অনেক সময়সাপেক্ষ বলেও মনে হয়েছিল নার্সিংয়ের ছাত্রী লুপি হার্নান্ডেজের।

জন্মসূত্রে লাতিন আমেরিকান এই তরুণীর মনে হয়েছিল, এমন কিছু জিনিস যদি থাকত, যাতে চটজলদি হাত পরিষ্কার করে নেওয়া যায়! জল বা সাবান অপ্রতুল হলেও ব্যস্ততার মধ্যে যাতে হাত জীবাণুমুক্ত করা যায়, লুপির মূল লক্ষ্য ছিল সেটাই। এই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

কীভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আবিষ্কার হলো?
রোগীর কাছে যাওয়ার আগে ও পরে নার্স ও ডাক্তারদের বারবার সাবান ও জল দিয়ে হাত ধুতে দিতো। এখন সব রকম পরিস্থিতিতে হাতের কাছে সাবান ও জল নাও পাওয়া যেতে পারে তখন কীভাবে জীবাণুমুক্ত হওয়া যাবে? তিনি ভাবলেন সাবান ও জলের পরিবর্তে যদি এমন কিছু জীবানুনাশক আবিষ্কার করা যায়, তাহলে যখন হাতের কাছে সাবান ও জল পাওয়া যাবে না তখন ও জীবাণুমুক্ত থাকা যাবে। এই ভাবনা থেকেই আবিষ্কারের তাগিদে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।

অবশেষে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অ্যালকোহল যুক্ত একটি জেল তৈরি করেন। এইযেল এর গুনাগুন পরীক্ষা করতে তিনি নিজের হাতেই সর্বপ্রথম সেটি প্রয়োগ করেছিলেন। স্যানিটাইজার এমনই একটি জেল যার ফলে জল ছাড়াই হাতে কয়েক ফোঁটা নিলেই জীবাণুমুক্ত থাকা যায়। তার এই অসাধারণ আবিষ্কারটি পুরো বিশ্বে সেই সময় ছড়িয়ে গিয়েছিল। আর তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার এর ব্যবহার করা শুরু। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের দাপটে লুপ হার্নান্দেজের আবিষ্কৃত এই জীবানুনাশক আজ মহা মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সকলের কাছে।

অ্যালকোহল স্যানিটাইজারের ইতিহাস
তবে এর আগে স্যানিটাইজার আবিষ্কৃত না হলেও জীবাণু মুক্ত হওয়ার জন্য অ্যালকোহল ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগেও ছিলো অ্যালকোহলের ব্যবহার। ১৮৭৫ সাল অবধি অ্যালকোহল অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে বৈজ্ঞানিক সমর্থন পায়নি।১৮৮০ এর দশকে অ্যালকোহল স্বাস্থ্যসেবার প্রধান স্তরে পৌঁছে যায়। সেইসময় অপারেশন করার আগে ত্বককে জীবাণুমুক্ত করার জন্য অ্যালকোহল’ ব্যবহার করা হতো।

১৯৪৮ সালের মধ্যে আমেরিকার প্রায় ৬৪ শতাংশ হাসপাতালেই জীবাণু ধ্বংস করার জন্য ইথানলের প্রয়োগ করা হতো। তবে এই সময় কিন্তু হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছিলনা। একদম আসল অ্যালকোহলটি সরাসরি ব্যবহার করা হতো! এরফলে জীবাণুমুক্ত হলেও ক্ষতি ও হয়েছে অনেক। হাতের চামড়ায় সরাসরি অ্যালকোহল প্রয়োগ করার ফলে হাতের চামড়া শক্ত হয়ে যেত।

সেই সময় বেশিরভাগ হাসপাতালে অ্যালকোহল ব্যবহার হওয়ার জন্য এক দম্পতি অ্যালকোহলের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৫২ সালে তাদের ব্যবসার রমরমা শুরু হয়। কারণ এই সময় হাসপাতালের পাশাপাশি স্কুল বিমানবন্দর ও আরো অনেক জায়গায় অ্যালকোহলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এরপর ফলাফল যা হলো তা আরো ভয়ানক। অধিক পরিমাণে অ্যালকোহল ব্যবহারের ফলে সকলের হাতের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। এমনকি ওই দম্পতির কারখানার শ্রমিকদের হাতের অবস্থা ও খারাপ হয়ে যায়। কারখানার শ্রমিকরা একে একে কারখানা ছেড়ে চলে যান। এরপর অ্যালকোহল স্যানিটাইজার বাজারে সরাসরি বিক্রি করা বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর ১৯৮৮ সালে জিওজিও সংস্থা পিওরএল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বাজারে আনেন। তবে এখনকার মতো এটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে বা বাড়ির প্রয়োজনে থাকতো না।তখন এটি জীবাণুনাশক অ্যালকোহল রূপে প্রচার পেয়েছিল তাই এটি কেবল হাসপাতাল, স্কুল ও রেস্তোরাঁর কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৯৭ সাল থেকে পিওর এল হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে নিয়ে আসেন। সেই সময় সাধারণ মানুষরাও হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে শুরু করেন। এরপর আমেরিকানরা প্রতিবছর প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতেন এই স্যানিটাইজারের জন্য।

হ্যান্ড স্যানিটাইজারের আধুনিকীকরণ
একবিংশ শতাব্দির পর থেকে এই স্যানিটাইজার রং ও সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন আকারের প্যাকেট ও বোতলে এই স্যানিটাইজার ভরে বাজারজাত করা হয়। এরপর দিন দিন এর ব্যবহার বাড়তেই থাকে। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পর্যন্ত তার বইয়ে এই স্যানিটাইজার এর কথা উল্লেখ করেছিলেন। বারাক ওবামা তার বই এ লিখেছিলেন তিনি যখন প্রথম জর্জ ডাব্লু বুশের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ করতে যান তখন জর্জ ডাব্লু বুশ তাকে স্যানিটাইজারের সুবিধার কথা বলেন। এরপর সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে স্যানিটাইজার এর ব্যবহার আরও বাড়তে থাকে।

চুয়ান্ন বছর আগে লুপি ভাবতেও পারেননি তাঁর আবিষ্কার একদিন জীবাণুআতঙ্কে ত্রস্ত পৃথিবীর কাছে অন্ধের যষ্টি হয়ে দেখা দেবে। তবে প্রথমদিকে কিন্তু আমজনতার মধ্যে আদৌ পরিচিত ছিল না এর ব্যবহার। হ্যান্ড স্যানিটাইজার তখন মূলত ছিল ডাক্তার, নার্স-সহ জনস্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রান্ত লোকজনের ব্যবহার্য জিনিস। তবে করোনাভাইরাসের অতিমারির আগে শহরের নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যেই সীমিত ছিল এর প্রচলন। প্রাণনাশের আতঙ্ক একে রাতারাতি সর্বসাধারণের মুঠোবন্দি করে তুলেছে।

Check Also

যে গ্রামের সবাই অন্ধ, জন্মের এক সপ্তাহ পরই দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে গৃহপালিত পশু ও শিশুরা!

মধ্য আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর বিচিত্র একটি গ্রাম টিলটেপেক। গ্রামটিতে জাপোটেক নামের একটি জাতির তিন শতাধিক ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *