Breaking News
Home / HEALTH / বর্তমানে করোনা মোকাবিলায় ব্রহ্মাস্ত্র প্লাজমা থেরাপি কি? এটি কীভাবে কাজ করে?

বর্তমানে করোনা মোকাবিলায় ব্রহ্মাস্ত্র প্লাজমা থেরাপি কি? এটি কীভাবে কাজ করে?

করোনা আবহে যেখানে কোনো বিশেষ চিকিৎসার অভাব আছে সেখানে মাঝে মধ্যেই একটা নাম শোনা গেছে – প্লাজমা থেরাপি।অনেককেই দেখা গেছে কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা খুঁজতে। কিন্তু বিস্তারিত ভাবে অনেকেই হয়তো জানেন না যে শত বছরের পুরোনো এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি আসলে কি? দেখে নেওয়া যাক এক চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সমস্ত দিক।

প্লাজমা কি?
মানব শরীরের একটি প্রধান উপাদান রক্ত, এবং এই রক্তের প্রধান উপাদান প্লাজমা যা রক্তের ৫৫ শতাংশ জুড়ে থাকে।রক্তে মূলত অনেক প্রকারের উপাদান থাকে যেমন কষিয় উপাদান, বিভিন্ন কণিকা (শ্বেত রক্ত কণিকা, অনুচক্রিকা, লোহিত রক্ত কণিকা) ইত্যাদি। রক্ত থেকে এই সমস্ত উপাদান বাদ দিকে পড়ে থাকে হলুদ বর্ণের প্লাজমা। এই প্লাজমা তে ৯০ শতাংশের বেশি জল থাকে।

প্লাজমার সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সম্পর্ক কি?
শরীরে যখন কোনো রোগ জীবাণুর আক্রমন হয় তখন শরীরের সাধারণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সেই রোগ জীবাণুর অ্যান্টিবডির নিঃসরণ ঘটায় এবং এই অ্যান্টিবডি রোগ জীবাণুর সাথে লড়াই করে তাকে হারিয়ে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। এই অ্যান্টিবডিগুলি প্লাজমাতেই ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং যেকোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে একপ্রকার অ্যান্টিবডি একরকম নির্দিষ্ট শত্রুর বিরুদ্ধেই কাজ করে। রক্তে অবস্থিত মেমরি সেল তাকে শত্রু ছিনিয়ে দিতে সাহায্য করে। সেই নির্দিষ্ট রোগ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেই মেমোরি সেল গুলি অ্যান্টিবডির তৈরির কাজে লেগে পড়ে।এভাবেই মানব শরীরে শত্রুর পরাজয় ঘটে।

কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা কি?
কোনও মানুষের শরীরে রোগ জীবাণু ধ্বংস হওয়ার পরেও একটি নির্দিষ্ট সময় প্লাজমা এর মধ্যেই সেই অ্যান্টিবডিগুলো থেকে যায়, তবে শত্রু ভেদে তার সময়কাল ভিন্ন। এই যে ব্যাক্তির সুস্থতার পর অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ যে প্লাজমা মানুষের শরীরে থাকে তাকেই কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা বলা হয়। এই কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা ওই একই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যাক্তির শরীরে দেওয়া গেলে অসুস্থ ব্যাক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং অসুস্থ রোগীর শরীরে আরও সেইরকম অ্যান্টিবডি খুব দ্রুত তৈরি হতে পারে।

এক কথায় একজনের অ্যান্টিবডি অন্য ব্যাক্তির শরীরে কাজ করবে। এভাবে অ্যান্টিবডি ধার করার প্রক্রিয়াকে পরোক্ষ ইমিউনিটি বলতে পারেন কারণ এটি আপনার শরীর নিজের থেকে তৈরি হচ্ছেনা বরং অন্যের অ্যান্টিবডি আপনার শরীরে ইনজেক্ট করা হচ্ছে।এই প্রক্রিয়াটিকে বলে কনভ্যালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি’।

কোন কোন ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে?
১৮৯০ সালে প্রথম জার্মান শারীরতত্ত্ববিদ এমিল ভন প্রথম এই প্রক্রিয়ায় ডিপথেরিয়া চিকিৎসা করে সাফল্য পান। তারপর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট রোগের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়।

যেমন ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু এর ক্ষেত্রে , ২০০৯ সালে এইচ১এন১ ভাইরাসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে, ২০০২ সালের সার্স মহামারী এর সময় প্লাজমা থেরাপি ব্যাবহার করে সাফল্য পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়

২০১৪ সালে ইবোলার সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্লাজমা থেরাপি দেওয়ার কথা বলেন এবং ২০১৫ সালে মার্স-এর চিকিৎসা এর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রটোকল ব্যাবহার করে চিকিৎসা করা হয়। এছাড়াও নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, এইচআইভি, পোলিও, মাম্পস, মিজেলস ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় এই প্লাজমা থেরাপির ব্যবহার দেখা গেছে।

বর্তমানে বিভিন্ন ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি ডিসঅর্ডার, জেনেটিক এম্ফাইসিমা, র‍্যাবিস, টিটেনাস, ক্যান্সার-চিকিৎসা, ডায়ালাইসিসের কাজে, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়।

কীভাবে এই প্লাজমা থেরাপি করা হয়?
সবার আগে সুস্থ ব্যাক্তির শরীর সম্পূর্ণ ভাবে ভাইরাস মুক্ত কিনা সেই বিষয় নিশ্চিত হতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যাক্তির সুস্থতার পরে সাত থেকে চোদ্দ দিন অপেক্ষা করা হয়। রোগ বিশেষে সেই সময়কাল পরিবর্তিত হতে পারে। নির্দিষ্ট সময় পরেও যদি রোগীর শরীরে রোগের কোনো লক্ষণ দেখা না যায় তবে বুঝতে হবে আক্রান্ত ব্যাক্তি প্লাজমা দিতে পারবেন। তবে তার সাথেই ব্যাক্তির শরীরে কোনো রক্তবহিত রোগ বা হেপাটাইটিস জাতীয় কোনো অসুখ আছে কিনা যাচাই করে নিতে হবে, তারপর প্লাজমা নেওয়া যাবে।

প্লাজমা দান করার এই প্রক্রিয়ার নাম ‘অ্যাফেরেসিস’। এর জন্য ব্যাক্তির হাতের শিরায় একটি সুচ দিয়ে রক্ত বের করে এনে নির্দিষ্ট মেশিন জমা করা হয় যেখানে ‘সেন্ট্রিফিউগেশন’ প্রক্রিয়ায় রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা হয়ে যায়। প্লাজমা বাদে বাকি যে রক্তের অংশ তা সুচের মাধ্যমে পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানো হয়।

যতক্ষণ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিমাণ প্লাজমা সংগৃহীত করা না হচ্ছে ততক্ষণ চক্রাকারে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। প্রায় দু ঘণ্টা ধরে এই প্রক্রিয়া চলে। তবে এই প্রক্রিয়ার পর সুস্থ ব্যাক্তি ক্লান্তি, গা গোলানো, মাথা ঘোরা ইত্যাদি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে পারেন। শরীরের সেই প্লাজমা এর ঘাটতি পূরণ করতে মূলত দু দিন সময় লাগে, তারপর ব্যাক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ অনুভব করবেন।

পুরো প্রক্রিয়াটি একবার করলেই ২০০-৬০০ সিসি পর্যন্ত প্লাজমা পাওয়া যেতে পারে যা তিনজন রোগীকে সুস্থ করে তুলতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে রুগীর এবং প্লাজমা দাতার ম্যাচিং টাইপ এর বেশ কিছু নিয়ম আছে। প্লাজমা সংগ্রহন করার পরে তা সাথে সাথে রোগীর শরীরে দিয়ে দেওয়াই ভালো নাহলে তা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংগৃহীত করা যায়। রোগীর শরীরে সেই প্লাজমা ইনপুট করা হলে রোগীর রক্তের সাথে সেই প্লাজমা এর মিশ্রণ ঘটে এবং সেই অ্যান্টিবডি রোগীর রক্তে মিশে কষীয় পর্যায় ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে পারে। এই অ্যান্টিবডি রোগ বিশেষ বেশ কিছু সপ্তাহ এমনকি বেশ কিছু মাস রোগীর দেহে থাকতে পারে।

এই থেরাপিতে কি কি ঝুঁকি আছে?
১. সংগ্রহণ করা প্লাজমা তে যদি ভাইরাস থেকে গিয়ে থাকে তবে রোগীর অবস্থার অবনতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে কারণ সেক্ষেত্রে রোগীর শরীরে আরও ভাইরাসের প্রবেশ ঘটানো হচ্ছে।

২. এই থেরাপিতে যেহেতু বাইরে থেকে শরীরে অতিরিক্ত প্লাজমা প্রবেশ করানো হয় তাই ফল স্বরূপ কার্ডিয়াক সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে যার ফলে শরীরে নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।

৩. অনেক সময় রোগীর শরীরের নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্লাজমা এর সাথে শরীরে প্রবেশ করানো কোনো উপাদানের বিরুদ্ধে সচল হতে পারে যার ফলে শরীরে বাড়তি অসুস্থতা দেখা যেতে পারে। তবে ‘প্যাথোজেন ডিটেকশন টেকনিক’ এবং আরো বেশ কিছু প্রক্রিয়া দ্বারা এই ধরনের ঝুঁকি এড়ানো যেতে পারে। এখনও পর্যন্ত এই থেরাপি নিয়ে বিভিন্ন ধাপে গবেষণা চলছে।

বর্তমান কোরোনা পরিস্থিতিতেও চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ এবং বাংলাদেশের বেশ কিছু স্থানে এই থেরাপি প্রয়োগ করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে এই প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা করালে পূর্বের থেকে দ্রুত সেরে উঠছে রুগীরা। তবে এই থেরাপির কার্যকারিতা যেতে আরও বাড়ানো যায় তা নিয়ে এখনও বিস্তর গবেষণা করছেন বিজ্ঞানী মহল।

Check Also

ঘুম থেকে উঠেই খালি পেটে কাচা ছোলা খাওয়ার ১৫ স্বাস্থ্য উপকারিতা জে’নে নিন!

কাঁচা ছোলার গুণ স’ম্পর্কে আম’রা সবাই কমবেশি জানি। প্রতি ১০০ গ্রাম ছোলায় আমিষ প্রায় ১৮ ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *